Thursday, 24 September 2015

ঈদুল আযহার সংক্ষিপ্ত কিছু আদব ও আহকাম

ঈদ মুবারাক।
ঈদুল আযহার সংক্ষিপ্ত কিছু আদব ও আহকাম :
১. তাকবীর : আরাফার দিনের ফজর থেকে শুরু করে
তাশরীকের দিনের শেষ পর্যন্ত, তথা জিলহজ মাসের
তের তারিখের আসর পর্যন্ত তাকবীর বলা। আল্লাহ
তাআলা
বলেন :
আর তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর নির্দিষ্ট দিনসমূহে।
(বাকারা
: ২০৩)
তাকবীর বলার পদ্ধতি :
” ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ، ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ، ﻻ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ، ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ ﻭﻟﻠﻪ ﺍﻟﺤﻤﺪ “
আল্লাহর যিকির বুলন্দ ও সর্বত্র ব্যাপক করার নিয়তে
পুরুষদের
জন্য মসজিদে, বাজারে, বাড়িতে ও সালাতের
পশ্চাতে উচ্চ
স্বরে তাকবীর পাঠ করা সুন্নত।
২. কুরবানী করা : ঈদের দিন ঈদের সালাতের পর
কুরবানী
করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন :
যে ব্যক্তি ঈদের আগে যবেহ করল, তার উচিত তার
জায়গায়
আরেকটি কুরবানী করা। আর যে এখনো কুরবানী
করেনি,
তার উচিত এখন কুরবানী করা। (বুখারী ও মুসলিম)
কুরবানী
করার সময় চার দিন। অর্থাৎ নহরের দিন এবং তার
পরবর্তী
তাশরীকের তিন দিন। যেহেতু রাসূলূল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
তাশরীকের দিন কুরবানীর দিন। (সহীহ হাদীস সমগ্র :
২৪৬৭)
৩. পুরুষদের জন্য গোসল করা ও সুগন্ধি মাখা : সুন্দর
কাপড়
পরিধান করা, ঢাকনার নিচে কাপড় পরিধান না করা,
কাপড়ের
ক্ষেত্রে অপচয় না করা। দাঁড়ি না মুণ্ডানো, এটা
হারাম।
নারীদের জন্য ঈদগাহে যাওয়া বৈধ, তবে আতর ও
সৌন্দর্য
প্রদর্শন পরিহার করে। মুসলিম নারীদের জন্য কখনো
শোভা পায় না যে, সে আল্লাহর ইবাদাতের জন্য
তাঁরই গুনাতে
লিপ্ত হয়ে ধর্মীয় কোন ইবাদাতে অংশ গ্রহণ করবে।
যেমন সৌন্দর্য প্রদর্শন, সুসগন্ধি ব্যবহার ইত্যাদি করে
ঈদগাহে উপস্থিত হওয়া।
৪. কুরবানীর গোস্ত ভক্ষণ করা। ঈদুল আজহার দিন
রাসূলূল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খানা খেতেন না,
যতক্ষণ না তিনি
ঈদগাহ থেকে ফিরে আসতেন, অতঃপর তিনি কুরবানী
গোস্ত থেকে ভক্ষণ করতেন।
৫. সম্ভব হলে ঈদগাহে হেঁটে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া :
ঈদগাহতেই সালাত আদায় করা সুন্নত। তবে বৃষ্টি বা
অন্য কোন
কারণে মসজিদে পড়া বৈধ, যেহেতু রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পড়েছেন।
৬. মুসলমানদের সাথে সালাত আদায় করা এবং খুতবায়
অংশ গ্রহণ
করা : উলামায়ে কেরামদের প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত
হচ্ছে,
ঈদের সালাত ওয়াযিব। এটাই ইবনে তাইমিয়া
বলেছেন, যেমন
আল্লাহ তাআলা বলেন :
অতএব তোমরা রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং নহর
কর।
(কাউসার : ২)
উপযুক্ত কোন কারণ ছাড়া ঈদের সালাতের ওয়াজিব
রহিত হবে
না। মুসলমানদের সাথে নারীরাও ঈদের সালাতে
হাজির হবে।
এমনকি ঋতুবতী নারী ও যবতী মেয়েরা। তবে ঋতুবতী
নারীরা ঈদগাহ থেকে দূরে অবস্থান করবে।
৭. রাস্তা পরিবর্তন করা : এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে
যাওয়া ও অপর
রাস্তা দিয়ে ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফেরা মুস্তাহাব।
যেহেতু তা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম
করেছেন।
৮. ঈদের সুভেচ্ছা জানানো : ঈদের দিন একে অপরকে
সুভেচ্ছা বিনিময় করা : যেমন বলা :
ﺗﻘﺒﻞ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻨﺎ ﻭﻣﻨﻜﻢ. ﺃﻭ ﺗﻘﺒﻞ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻨﺎ ﻭﻣﻨﻜﻢ ﺻﺎﻟﺢ ﺍﻷﻋﻤﺎﻝ .
অর্থ : আল্লাহ আমাদের থেকে ও তোমাদের থেকে
নেকআমলসমূহ কবুল করুন। বা এ ধরণের অন্য কিছু বলা।
এ দিনগুলোতে সাধারণ ঘটে যাওয়া কিছু বেদআত ও
ভুল
ভ্রান্তি থেকে সকলের সতর্ক থাকা জরুরী : যেমন :
১. সম্মিলিত তাকবীর বলা : এক আওয়াজে অথবা
একজনের
বলার পর সকলের সমস্বরে বলা থেকে বিরত থাকা।
২. ঈদের দিন হারাম জিনিসে লিপ্ত হওয়া : গান
শোনা, ফিল্ম
দেখা, বেগানা নারী-পুরুষের সাথে মেলামেশা করা
ইত্যাদি
পরিত্যাগ করা।
৩. কুরবানী করার পূর্বে চুল, নখ ইত্যাদি কর্তন করা।
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানী
দাতাকে জিলহজ মাসের
আরম্ভ থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তা থেকে বিরত
থাকতে বলেছেন।
৪. অবপচয় ও সীমালঙ্ঘন করা : এমন খরচ করা, যার
পিছনে
কোন উদ্দেশ্য নেই, যার কোন ফায়দা নেই, আর না
আছে যার কোন উপকার। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
আর তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি
অপচয়কারীদেরকে ভালবাসেন না। (আনআম : ১৪১)
করবানীর বৈধতা ও তার কতক বিধান :
কুরবানীর অনুমোদনের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা
বলেন।
অতএব তোমরা রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং নহর
কর।
(কাউসার : ২)
তিনি আরো বলেন :
আর কুরবানীর উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর
অন্যতম নিদর্শন বানিয়েছি। (হজ : ৩৬)
কুরবানী সুন্নতে মুয়াক্কাদা। সামর্থ থাকা সত্বে তা
ত্যাগ করা
মাকরুহ। আনাস রাদিআল্লাহু আনহুর হাদীসে রয়েছে,
যা
বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। তারা বলেন :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
তরতাজা ও শিং ওয়ালা দুটি
মেষ নিজ হাতে যবেহ করেছেন এবং তিনি তাতে
বিসমিল্লাহ
ও তাকবীর বলেছেন।
কুরবানীর পশু : উঠ, গরু ও বকরী ছাড়া কুরবানী শুদ্ধ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে,
যেসমস্ত জন্তু
তিনি রিয্ক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। (হজ : ৩৪)
কুরবানী শুদ্ধ হওয়ার জন্য ত্রুটি মুক্ত পশু হওয়া জরুরী :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম
বলেছেন : কুরবানীর
পশুতে চারটি দোষ সহনীয় নয় : স্পষ্ট কানা, স্পষ্ট
অসুস্থ্য,
হাড্ডিসার ও ল্যাংড়া পশু। (তিরমিযী : কিতাবুল হজ :
৩৪)
যবেহ করার সময় : ঈদের সালাতের পর কুরবানীর সময়
শুরু
হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন :
যে সালাতের পূর্বে যবেহ করল, সে নিজের জন্য যবেহ
করল। আর যে খুতবা ও ঈদের সালাতের পর কুরবানী
করল,
সে তার কুরবানী ও সুন্নত পূর্ণ করল। (বুখারী ও মুসলিম)
যে সুন্দর করে যবেহ করার ক্ষমতা রাখে তার উচিত
নিজ
হাতে কুরবানী করা। কুরবানীর সময় বলবে :
ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ، ﺍﻟﻠﻬﻢ ﻫﺬﺍ ﻋﻦ ﻓﻼﻥ
কুরবানীকারী নিজের নাম বলবে অথবা যার পক্ষ
থেকে
করবানী করা হচ্ছে তার নাম বলবে । যেমন রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
{ ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ، ﺍﻟﻠﻬﻢ ﻫﺬﺍ ﻋﻨﻲ ﻭﻋﻦ ﻣﻦ ﻟﻢ ﻳُﻀﺢ ﻣﻦ ﺃﻣﺘﻲ }
[ ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ ﻭﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ ] ،
বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার; হে আল্লাহ, এটা
আমার পক্ষ
থেকে এবং আমার উম্মতের মধ্যে যারা কুরবানী
করেনি,
তাদের পক্ষ থেকে। (আবূদাউদ ও তিরমিযী)
কুরবানীর গোস্ত ভণ্টন করা : কুরবানী পেশকারী
ব্যক্তির
জন্য সুন্নত হচ্ছে কুরবানীর গোস্ত নিজে খাওয়া,
আত্মীয় ও প্র্রতিবেশীদের হাদিয়া দেয়া এবং
গরীবদের
সদকা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন :
অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ-দরিদ্রকে
থেকে
দাও। (হজ : ২৮)
তিনি আরো বলেন :
তখন তা থেকে খাও। যে অভাবী, মানুষের কাছে হাত
পাতে না এবং যে অভাবী চেয়ে বেড়ায়-তাদেরকে
খেতে দাও। (হজ : ৩৬)
পূর্বসূরীদের অনেকের পছন্দ হচ্ছে, কুরবানীর
গোস্ত তিনভাগে ভাগ করা। এক তৃতীয়াংশ নিজের
জন্য রাখা।
এক তৃতীয়াংশ ধনীদের হাদীয়া দেয়া। এক তৃতীয়াংশ
ফকীরদের জন্য সদকা করা। পারিশ্রমিক হিসেবে
এখান
থেকে কসাই বা মজদুরদের কোন অংশ প্রদান করা
যাবে না।
কুরবানী পেশকারী যা থেকে বিরত থাকবে : যখন
কেউ
কুরবানী পেশ করার ইচ্ছা করে আর জিলহজ মাস
প্রবেশ
করে, তার জন্য চুল, নখ অথবা চামড়ার কোন অংশ
কাটা হারাম,
যতক্ষণ না কুরবানী করে। উম্মে সালমার হাদীসে
রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
{ ﺇﺫﺍ ﺩﺧﻠﺖ ﺍﻟﻌﺸﺮ ﻭﺃﺭﺍﺩ ﺃﺣﺪﻛﻢ ﺃﻥ ﻳﻀﺤﻲ ﻓﻠﻴﻤﺴﻚ ﻋﻦ ﺷﻌﺮﻩ
ﻭﺃﻇﻔﺎﺭﻩ } [ ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺣﻤﺪ ﻭﻣﺴﻠﻢ] ، ﻭﻓﻲ ﻟﻔﻆ : { ﻓﻼ ﻳﻤﺲ ﻣﻦ ﺷﻌﺮﻩ
ﻭﻻ ﺑﺸﺮﻩ ﺷﻴﺌﺎً ﺣﺘﻰ ﻳﻀﺤﻲ }
যখন জিলহজ মাসের দশ দিন প্রবেশ করে এবং
তোমাদের
কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে, সে তখন থেকে চুল ও
নখ কর্তন থেকে বিরত থাকবে। ইতিপূর্বে যা কর্তন
করেছে, সে জন্য তার কোন গুনা হবে না।
কুরবানী দাতার পরিবারের লোক জনের নখ, চুল
ইত্যাদি
কাঁটাতে কোন সমস্যা নেই।
কোন কুরবানী দাতা যদি তার চুল, নখ অথবা চামড়ার
কোন অংশ
কেঁটে ফেলে, তার জন্য উচিত তাওবা করা,
পুনরাবৃত্তি না করা,
তবে এ জন্য কোন কাফ্ফারা নেই এবং এ জন্য
কুরবানীতে
কোন সমস্যা হবে না। আর যদি ভুলে, অথবা না জানার
কারণে
অথবা অনিচ্ছাসত্বে কোন চুল পড়ে যায়, তার কোন
গুনা
হবে না। আর যদি সে কোন কারণে তা করতে বাধ্য হয়,
তাও
তার জন্য জায়েয, এ জন্য তার কোন কিছু প্রদান
করতে
হবে না। যেমন নখ ভেঙ্গে গেল, ভাঙ্গা নখ তাকে কষ্ট
দিচ্ছে, সে তা কর্তন করতে পারবে, তদ্রূপ কারো চুল
বেশী লম্বা হয়ে চোখের উপর চলে আসছে, সেও
চুল কাঁটতে পারবে অথবা কোন চিকিৎসার জন্যও চুল
ফেলতে পারবে।
মুসলিম ভাইদের প্রতি আহব্বান : আপনারা উপরে
বর্ণিত
নেকআমল ছাড়াও অন্যান্য নেকআমলের প্রতি যত্নশীল
হোন। যেমন আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা-সাক্ষাত
করা, হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করা, একে অপরকে
মহব্বত করা এবং
গরীব ও ফকীরদের উপর মেহেরবান হওয়া এবং তাদের
আনন্দ দেয়া ইত্যাদি।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে তাঁর
পছন্দনীয়
কথা, কাজ ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

No comments:

Post a Comment